গত দশক থেকে ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃতির ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান থাকা সত্বেও বাংলাদেশে এই সেবার ব্যবহার, সুযোগ এবং দক্ষতা লিঙ্গ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থাভেদে বেশ বৈষম্যমূলক। এখানে গ্রামীণ জনপদের মাত্র ৩৭% পরিবারের ইন্টারনেট ব্যবহারর সুযোগ রয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারে যে দক্ষতা প্রয়োজন তা রয়েছে ১৩% পরিবারের। অর্থাৎ ৬৩% পরিবারের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অফ গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য ও পর্যবেক্ষণ। বিআইজিডির সিনিয়র অ্যাডভাইজর মুহাম্মদ মুশাররফ হোসেন ভূইয়া, রিসার্চ ফর পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (আরপিজি) বিভাগের প্রধান মেহনাজ রাব্বানী. অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) এর পলিসি অ্যাডভাইজার আনীর চৌধুরী ওয়েবিনারে আলোচনা করেন।
বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন।
ইন্টারনেট অবকাঠামোতে বিদ্যমান এই বৈষম্যকে প্রথম স্তরের “ডিজিটাল বৈষম্য” এবং অনলাইন দক্ষতা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরনের ওপরে ভিত্তি করে দ্বিতীয় স্তরের “ডিজিটাল বৈষম্য” চিহ্নিত করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে।
রবিবার বিআইজিডি আয়োজিত একটি ওয়েবিনারে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এই দুই ধরনের “ডিজিটাল বৈষম্য” নিয়ে করা গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ডঃ মোহাম্মাদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী।
“এই গবেষণা থেকে আমরা দেখতে পাই, প্রাপ্তি-স্বল্পতা ও অল্প দক্ষতা গ্রামীণ বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকে সীমিত করে দিচ্ছে। যে সকল বিষয়গুলো এই আধুনিক সমস্যা সৃষ্টি করছে তা দূর করতে হবে আর সেটা করতে হলে সতর্কতার সাথে নীতিমালা গ্রহণ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।“- বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন
মোট ৬,৫০০ পরিবারের ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে- বয়স, পরিবাদের আকার, আয়, শিক্ষা, পেশা, লিঙ্গ, বসবাসের স্থান ইত্যাদির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে ইন্টারনেট প্রাপ্তি, ব্যবহার ও অনলাইন দক্ষতার ক্ষেত্রে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১৫-২৪ বছর বয়সীরা অন্যান্য বয়সের ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং সে ব্যাপারে তারা বেশ দক্ষ।
গবেষণায় পরিবারের আকার এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের মধ্যে একটি গভীর ইতিবাচক সম্পর্কও পাওয়া গেছে। ছোট পরিবারে থাকা একজন সদস্যের চেয়ে বড় পরিবারে থাকা একজন সদস্য ইন্টারনেট ব্যবহারে এগিয়ে থাকে। যদিও বড় পরিবার মানেই যে অনলাইন দক্ষতা ও ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার অর্জন, তা নয়।
ইন্টারনেট প্রাপ্তির জন্য সাক্ষরতা ও শিক্ষা-উভয়ই গুরুত্বপূণ পূর্বশর্ত। গবেষণায় দেখায় যায়, অস্বাক্ষর মানুষের (৯%) তুলনায় সাক্ষর মানুষদের (৪৭%) ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বেশি। শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধির সাথে সাথে অনলাইন দক্ষতা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। যদিও গবেষণা থেকে দেখা যায়, অশিক্ষিত লোকজন এবং এসএসসির নিচে যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাঁদের অনলাইন দক্ষতায় ও ইন্টারনেট ব্যবহারে কোন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। একজন মানুষ অন্তত এসএসসি বা সমমানের ডিগ্রি অর্জন করা ব্যক্তিরা ইন্টারনেট ব্যবহারে ও অনলাইনে তুলনামূলক বেশি দক্ষ।
“শুরু থেকেই এ দেশের নাগরিকেরা নানা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। যদি আমরা জনগণের মাঝে যথাযথ ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো ও তা ব্যবহারের দক্ষতা তৈরি না পারি, তাহলে বৈষম্য আরও প্রকট হবে। শুধু তাই নয়, নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আমরা যে সাফল্য অর্জন করেছি, এর ফলে তাও ব্যর্থ হতে পারে।“
- বিআইজিডির রিসার্চ ফর পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (আরপিজি) বিভাগের প্রধান মেহনাজ রাব্বানী
শিক্ষা ও স্বাক্ষরতার মতই, একজনের অর্থনৈতিক অবস্থাও তার ইন্টারনেট প্রাপ্তি, ব্যবহার ও অনলাইন দক্ষতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে যাদের মাসিক আয় ৩০,০০০ টাকা বা তার ওপরে, তাঁরা সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট সুবিধাপ্রাপ্ত (৭৪%)। পারিবারিক আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে ইন্টারনেটের প্রাপ্যতাও বাড়ে। দেখা গেছে যারা ৩০,০০০ বা এর চেয়ে কম উপার্জন করে, তাঁদের উভয়ের ক্ষেত্রেই অনলাইন দক্ষতা সমান (৩৫%)। তাঁদের আয়ের পরিমান বৃদ্ধি পেলে অনলাইন দক্ষতা ৪১% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের আয় ২০,০০০ এর ওপরে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো ধরনের আয়-ব্যবধান নেই। অর্থাৎ, গ্রামীণ বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহারের জন্য ২০,০০০ এর বেশি টাকা উপার্জন করা প্রয়োজন।
গবেষণা থেকে আরও জানা যাচ্ছে, কৃষিখাতে কর্মরতদের ইন্টারনেট প্রাপ্যতা সবচেয়ে কম (১৭%) এবং শিক্ষার্থীদের প্রাপ্যতা সবচেয়ে বেশি (৭০%)। যারা বেকার বা অ-কৃষিখাতে কর্মরত তাঁদের তুলনায়ও শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট দক্ষতায় এগিয়ে (৪৬%) আর কৃষিতে যুক্তদের দক্ষতা সবচেয়ে কম (২৬%)। ইন্টারনেট ব্যবহারে শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে এবং বেকাররা সবচেয়ে পিছিয়ে।
ডিজিটাল বৈষম্য একটি জটিল ইস্যু। তবে আমরা ডিজিটাল সেবার প্রসারের মাধ্যমে সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সময়, মূল্য এবং দূরত্ব হ্রাস করতে কাজ করছি। দেশের ডিজিটাল সেন্টারগুলো ডিজিটাল ও নন ডিজিটালের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করছে। দেশে যে ৯ লাখ এমফএস আউটলেট আছে তাই আমার ফোন না থাকলেও কিন্তু অস্বচ্ছল বয়স্করা ভাতা নিতে পারছেন। তাই সব ক্ষেত্রে সকলের ডিজিটাল দক্ষতার প্রয়োজন বাধ্যতামূলক হচ্ছে না। তবে আমার ডিজিটাল সুবিধা পাচ্ছি। তাই গণহারে ডিজিটাল দক্ষতা গড়ে তোলার চেয়ে অর্থপূর্ণ ডিজিটাল দক্ষতার এটি বেসিক ধারা তৈরি করতে হবে।
“ইন্টারনেট একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যদি ঠিকমত এটিকে ব্যবহার করা না যায়, তবে বাংলাদেশে বিদ্যমান যেকোন বৈষম্যকে এটি আরও বড় করে তুলতে পারে।” - এটুআই নীতি উপদেষ্টা আনীর চৌধুরি
গ্রামীণ বাংলাদেশে ইন্টারনেটের প্রাপ্তি, ব্যবহার ও দক্ষতার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ন লৈঙ্গিক ব্যবধান রয়েছে বলে গবেষণায় জানা গেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগের দিক থেকে নারীদের তুলনায় ১৮% এবং অনলাইন দক্ষতার ক্ষেত্রে ৮% এগিয়ে আছেন পুরুষেরা। একইভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীদের চেয়ে এগিয়ে আছেন পুরুষেরা।
আন্তঃবিভাগীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগের দিক থেকে রংপুর সবচেয়ে পিছিয়ে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামে এই হার সবচেয়ে বেশি, ঢাকা ও খুলনা রয়েছে তারপরেই। অনলাইন দক্ষতার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীর সাথে রংপুরের তেমন কোন পার্থক্য নেই। অনলাইন দক্ষতায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে বরিশাল এবং তারপরেই ময়মনসিংহ। ইন্টারনেট ব্যবহারে খুলনার অবস্থান বেশ ভালো; এক্ষেত্রে সিলেটের অবস্থা খুব খারাপ এবং অনলাইন দক্ষতা ও ব্যবহারেও এই বিভাগ বেশ পিছিয়ে।
ডঃ সিদ্দিকী তাঁর বক্তব্যে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইসিটি সুবিধা প্রণয়ন ও অনুশীলন, ইন্টারনেট সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং লৈঙ্গিক মাত্রার দিকে লক্ষ্য রাখলে “ডিজিটাল বৈষম্য” দূর করা সম্ভব।